প্রতিশোধ, বাস্তবতা, ন্যায় বিচার

সুবর্ণা মুস্তফার সাথে একবার হুমায়ুন ফরিদীর প্রচণ্ড ঝগড়া হলো, রাগ করে সুবর্ণা অন্য রুমে গিয়ে দরজা আটকে শুয়ে পড়লেন।
.
সুবর্ণা সকালে উঠে দরজা খুলে দেখেন, যেই রুমে ঝগড়া হয়েছিল, সেই রুমের মেঝে থেকে ছাদের দেয়াল পর্যন্ত একটি কথাই লিখে পুরো রুমকে ভরে ফেলা হয়েছে, কথাটি হলো- 'সুবর্ণা, আমি তোমাকে ভালোবাসি'|
.
এতো ভালোবাসাও তাদের বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারেনি। ২০০৮ সালে ডিভোর্স হয়। কারণ ভালোবাসা রঙ বদলায়..!
.
জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন- 'প্রেম ধীরে মুছে যায়; নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।'
.
এই জীবনানন্দকে একবার দেখেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে লাবণ্যপ্রভা। সাহিত্যের ছায়া থেকে একশ হাত দূরে থেকেও সাহিত্যের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এই লাবণ্য।
.
সেও কিছুকাল পরে টের পায় তার স্বাধীনতা হারিয়ে যাচ্ছে। মুক্তির জন্য ছটফট করতে থাকে। দুর্বিষহ হয়ে উঠে দুজনের জীবন। প্রেম সত্যি একসময় মুছে যায়।
.
গুলতেকিন নামের ক্লাস টেনের সেই কিশোরী হুমায়ুনের প্রেমে অন্ধ হয়ে বিয়ে করে ফেলে।
.
বিয়ের পরে সে জানতে পারে যে লেখক হুমায়ুন আহমেদ মানুষ হিসেবে খুবই সাধারণ। বাস্তব জীবনে সে চাঁদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে না, কবিতা আওড়ায় না। তার মধ্যে আলাদা কিছু নেই। সে আর দশটা মানুষের মতোই সাধারণ।
.
স্বপ্ন ভঙ্গের মতো ব্যাপার" গুলতেকিন বারবার বলতে থাকে- 'তোমার লেখাই ভালো, অন্যকিছু ভালো না।' আসলেই ভালোবাসা রঙ বদলায়!
.
নন্দিতা রায়ের 'বেলাশেষে' এই কঠিন ব্যাপারটা খুব সহজভাবে বুঝানো হয়েছে-
.
'হাতের ওপর হাত রাখা খুব সহজ, সারাজীবন বইতে পারা সহজ নয়!'
.
সহজ না হওয়ার কারণ ঐ একটাই- 'ভালোবাসা রঙ বদলায়' ।
.
অর্থাৎ, দুনিয়াতে কিছু মানুষ এমন থাকবে যে, আপনি তাদের যদিই ভালোবাসেন না কেন? পুজিবাদী ও বস্তবাদী দুনিয়ার এই মানুষদের ভালোবাসার রঙ বদলায়। 
.
সকালে যে সূর্যের উদয় হয়েছে, সন্ধ্যা হতেই সেই সূর্য অস্ত গেলো, আলোক উজ্জ্বল আকাশ আঁধার রাতের অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। যে লোক কেবল সকাল দেখেছে, কখনো সন্ধ্যা দেখে নি, সে কখনো বিশ্বাস করবে না এমন উত্তপ্ত সূর্যও চোখের সীমানা থেকে অদৃশ্য হতে পারে। সে কখনো জানবে না আলোকিত আকাশ কীভাবে অন্ধকারে ছেয়ে যায়।
.
যে শিশুকে কখনো ক্ষুধার জ্বালা বুঝতে দেওয়া হয় নি, আরাম আর বিলাসিতায় বড় করা হয়েছে, কখনো জানে নি যন্ত্রণা কী এবং ভয় কী, কখনো শিকার হয় নি বৈষম্যের আর সহিংসতার- সেই শিশুর কাছে বিশাল একটা জগত অদৃশ্যই রয়ে গেছে। সে কেবল সোনালি ঝকঝকে দিনের বেলার আকাশ দেখেছে, সে কখনো রাতের আঁধারের আকাশ দেখে নি।
.
রাতের আঁধার না দেখা সেই শিশু কখনোই বুঝবে না, অন্ধকারের নিঃসঙ্গ ছমছমে ভয়ের অনুভূতি কী, রাতের আঁধার গ্রাস করলেও কীভাবে সেই অন্ধকার কাটিয়ে পথ চলতে হয়। অতএব, ঝলমলে আলোয় অবস্থান রত মানুষের কথা কী করে রাতের আঁধার দেখা লোকেদের নির্দেশনা দিবে? তা কি আদোও সম্ভব? যদি না তারা অনুভূব করে, বুঝতে পারে?
.
কিন্তু মানব জাতির রব জানেন সব কিছু সম্পর্কে। তিনি তাঁর কুরআনে কোনো বক্রতা রাখেন নি। কুরআন একটি ইউনিভার্সাল কিতাব যা সকল মানুষের জন্য। আল্লাহ এমন কোনো সত্ত্বা নন যিনি কেবল এক প্রান্তের লোকেদের কথা বিবেচনা করেন এবং অপরপক্ষকে ভুলে যান। আল্লাহ হচ্ছেন তিনি, যিনি নিপীড়িতদের রব।
.
১৩ বছর আল্লাহর রাসূল (স) মক্কায় দাওয়াহর কাজ করেছেন, আর তাতে সাড়া দিয়েছিলেন অল্প কিছু সাহাবী। দ্বীন গ্রহণের ফলে তাদের উপর নেমে আসে অসহনীয় নির্যাতন, নিপীড়ন। তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।
.
অতঃপর মক্কা থেকে মদিনায় গেলেন। মদিনায় আনসার সাহাবীদের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক হলো। দিন ভালোই কাটছিলো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাহাবাদের। সব কিছু ভুলে নতুন করে নতুন ভূমিতে দিন কাটানো যেত। টিপিক্যাল বাঙালী হলে হয়তো সেটাই হতো। সব নির্যাতন সয়ে সস্তা "ক্ষমা" শব্দটা উচ্চারণ করে এগিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু এই দ্বীন মর্যাদাশীল রবের দ্বীন, যিনি প্রতিশোধ গ্রহণকারী আর শাস্তি দানে কঠোর।
.
তিনি আয়াত নাযিল করলেন, "মোকাবেলার অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’।" - [সূরা হাজ্জ: ৩৯-৪০]
.
তিনি আরো বলেছেন, "এটাই প্রকৃত অবস্থা। আর যে ব্যক্তি নিপীড়িত হয়ে তার সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করে; অতঃপর যদি তার উপর আবার নিপীড়ন করা হয় তাহলে আল্লাহ অবশ্যই নিশ্চিতভাবে তাকে সাহায্য করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পাপ মোচনকারী, অতীব ক্ষমাশীল।" - [সূরা হাজ্জ: ৬০]
.
এই হচ্ছে সেই মহিমান্বিত দ্বীন যা দুর্বলদের উদ্বুদ্ধ করে প্রতিশোধ নিতে, আর সবলদের উৎসাহিত করে ক্ষমা করতে। অতএব, তাদের উচিৎ নয় ভীত হওয়া, যারা স্বীয় রবের দিক নির্দেশনা অনুসরণ করে, আর দুনিয়ার ফলাফল এতে যাই আসুক না কেন। কেননা, দুনিয়ার এই প্রকৃতির রুলসের সৃস্টিকর্তা তো তিনিই আর তিনিই দুনিয়াকে তার নিয়মে ব্যালেন্সকারী ।
.
তিনি বলেছেন, "আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় এবং মাসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।" [২২:৪০]
.
 ‘(হে নবি!) তুমি কখনো মনে করো না যে, জালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। [১৪:৪২]
.
কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
ক. ফায়সালা করতে যখন কথা বলবে, তখন (বাদী ও বিবাদী পক্ষ) নিজের আত্মীয় পরিজন হলেও ইনসাফকে অগ্রাধিকার দিবে। (সূরা আনয়াম: রুকু ১৯)। 
.
খ. ইরশাদ হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার বর্জনের প্রতি প্ররোচিত না করে, তোমরা সুবিচার করবে, ইহা তাকওয়ার অধিক নিকটতর।’ (সূরা মায়িদাহ: রুকু ২)।
.
‘তোমরা যখন লোকদের মধ্যে ফায়সালা করবে তখন আদল-ইনসাফের সাথে করবে। - [সূরা আন নিসা : ৫৮]

Comments

Popular posts from this blog

AGI, Technological Singularity, Transhumanism

তারা পথপ্রদর্শিত হয়েছিল সৎবাক্যের দিকে এবং পরিচালিত হয়েছিল প্রশংসিত আল্লাহর পথপানে.........

প্যাগান বিলিফের প্রত্যাবর্তন